
দুই বছরের গৃহযুদ্ধে সুদানে ‘বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট’
সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ দুই বছর পেরিয়ে গেছে, এবং এই সময়ে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, এই সংকটের মাত্রা এতটাই গভীর যে তা বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গৃহযুদ্ধের সূচনা ও বিবরণ
গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল সুদানের সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) এর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই থেকে। এই সংঘর্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী খার্তুম থেকে শুরু করে দারফুর এবং গেজিরা অঞ্চলে। দুই বছরের এই সংঘর্ষে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে ।
মানবিক সংকটের মাত্রা
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা
বর্তমানে সুদানের প্রায় ২৪.৬ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলের জামজাম শরণার্থী শিবিরে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে ।
স্বাস্থ্যসেবা ও রোগবালাই
গৃহযুদ্ধের ফলে সুদানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতির কারণে কলেরা, ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত, সুদানে ৩০,৩১২টি কলেরা কেস এবং ৮৮৬টি মৃত্যু রিপোর্ট করা হয়েছে ।UNICEF
শিশুদের অবস্থা
সুদানে প্রায় ১৩ মিলিয়ন শিশু মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই অপুষ্টি, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং মানসিক ট্রমার শিকার। UNICEF এর মতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪ মিলিয়ন শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে ।
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও প্রতিক্রিয়া
দুই বছরের গৃহযুদ্ধে সুদানে। গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সম্মেলনে, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন মিলিতভাবে সুদানের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । তবে, এই সহায়তা সুদানের বর্তমান সংকট মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
প্রতিবেশী দেশগুলিতে প্রভাব
সুদানের গৃহযুদ্ধের ফলে প্রায় ৩ মিলিয়ন মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে, যার মধ্যে চাদ, দক্ষিণ সুদান, মিশর, ইথিওপিয়া এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র উল্লেখযোগ্য। এই দেশগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে, এবং তাদের নিজস্ব সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে শরণার্থীদের সহায়তা প্রদান কঠিন হয়ে পড়েছে ।
ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট
বর্তমানে সুদানে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অটল, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
দুই বছরের গৃহযুদ্ধে সুদানে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে, সুদানের মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে এবং এর প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুদানের গৃহযুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকট একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সুদানের জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।