প্রথম বসন্ত

আজ  শুক্রবার ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি ,২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ 

আজ  শুক্রবার ১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি ,২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ 

Click Here

রাজপথে সভা-সমাবেশে জনভোগান্তি: বিকল্প নির্দিষ্ট স্থানের প্রয়োজনীয়তা

রাজপথে সভা সমাবেশ মিছিল মানেই জনভোগান্তি
মিটিং মিছিলের জন্য একটা নির্দিষ্ট
এলাকা ঠিক করা যায় না?

গত ৬ আগস্ট (২০২৫) বুধবার দুপুরে আমার বড় কন্যা নূরতাজ তাফহিমা খানকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ফয়েস লেক এলাকায় অবস্থিত ইউএসটিসিতে যাই। জামালখান ডিসি হিল এলাকার বাসা থেকে টেক্সিযোগে রওনা হই। মেয়ে গত জুলাই মাস থেকে ইউএসটিসিতে অনার্সে বায়োকেমিস্ট্রি ও বায়োটেকনোলজিতে অধ্যয়ন করছে। ওই দিন দুপুর থেকে চট্টগ্রাম নগরে নিউ মার্কেট মোড়ে যেন অচলাবস্থা। বিএনপির পূর্বঘোষিত সভা-বিজয় মিছিল কর্মসূচিকে ঘিরে নগরীর এক বড় ব্যস্ততম এলাকায় যান চলাচল স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে রাস্তায় শত শত গাড়ির জটলা তৈরি হয়। বিকেল ৩টার দিকে আমি জিইসি মোড় থেকে রিকশাযোগে সদরঘাটের দিকে রওনা হই। কাজির দেউড়ি এলাকা পার হতেই আমার রিকশার গতি কমে যায়। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের খণ্ড খণ্ড মিছিল নিউ মার্কেট এলাকার দিকে যেতে থাকে। ফলে জুবিলি রোড, এনায়েত বাজার এলাকাসহ বিরাট এলাকা যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। আমাকে বহনকারী রিকশাটি থেমে থেমে রিয়াজুদ্দিন বাজার তিনপুল মসজিদ মোড় এলাকা পর্যন্ত গিয়ে আর সামনে যেতে পারেনি। ওখানে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আমি রিকশা থেকে নেমে পড়ি। হেঁটে নিউ মার্কেট এলাকা অতিক্রম করে সদরঘাট অভিমুখী আরেকটি রিকশায় উঠি। সদরঘাটে অবস্থিত ডায়মন্ড সিমেন্টের নির্বাহী (সেলস) বন্ধুবর জনাব মুহাম্মদ আবদুর রহিমের সঙ্গে সাক্ষাতে আমার সদরঘাটে যাওয়া। বহুদিন ওই এলাকায় যাইনি। সিটি কলেজ, ইসলামিয়া কলেজ পেরিয়ে সদরঘাট মোড় যাওয়ার আগেই সড়কের অবস্থা দেখে আমার আক্কেল গুড়ুম। সদরঘাট-মাঝিরঘাট সড়কটি এতই ভাঙাচোরা ও নাজুক যে যা লিখে ব্যক্ত করা যাবে না। সড়কে বড় বড় গর্ত, বিরাট খানা-খন্দ। দেখলাম, ৮/১০/১২ চাকার বড় বড় লরি, কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক বিকট শব্দে এই ভাঙাচোরা রাস্তা ধীরে ধীরে পার হচ্ছে। আমাকে বহন করা রিকশাওয়ালা আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, দেখেন তো রাস্তার কী বিশ্রী অবস্থা। ৩০ টাকা ভাড়ায় এই রাস্তা পার হওয়া পোষায়? ভেবে দেখলাম সত্যি তো! নগরে সদরঘাট-মাঝির
ঘাটের মতো এতো খারাপ-বিধ্বস্ত রাস্তা থাকে কী করে? নগর পিতা মেয়র তা কি দেখেন না? নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত সড়কের এ বেহাল দশা হবে কেন? কী জবাব দেবেন মেয়র মহোদয়!
রহিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা শেষে এখন যাবো মুরাদপুরে শাহ আমানত হজ্ব কাফেলা অফিসে মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াছিন সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতে। মাঝিরঘাট নজু মিয়া মসজিদ এলাকায় কোনো ট্যাক্সি দেখলাম না। দুয়েকটি রিকশা আছে। নিউ মার্কেট মোড়ের জনসভার কারণে কোনো রিকশা ওদিকে যেতে চাচ্ছে না। একটু বেশি ভাড়া অর্থাৎ ৫০ টাকা দিয়ে একটি রিকশাযোগে আইস ফ্যাক্টরি রোড হয়ে নিউ মার্কেটের আগে থামলাম। তখন পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য। নিউ মার্কেট এলাকার আশপাশের সব রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ। গন্তব্যে যেতে সবাই হাঁটছে। আমি হেঁটে রিয়াজুদ্দিন বাজার এলাকার মোড়ে এসেও মুরাদপুরের গন্তব্যে যেতে কোনো ট্যাক্সি-রিকশা বা বাস পাইনি। তবে একটি টেক্সি দেড়শত টাকা ভাড়ায় মুরাদপুরে যেতে রাজি ছিল। কিন্তু বাড়তি ভাড়ার কারণে তাতে উঠিনি। হঠাৎ দেখি ২/৩ টি টেম্পু। রাইফেল ক্লাবের পাশ থেকে বহদ্দারহাট কাপ্তাই রাস্তার মাথার গন্তব্যে যাওয়া একটি টেম্পুতে হুমড়ি খেয়ে উঠে পড়লাম। টেম্পুটি শহীদ মিনার হয়ে সিনেমা প্যালেস কাটা পাহাড় পুরাতন টিএন্ডটি রোড পার হয়ে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত যেতে প্রায় ২০/২৫ মিনিট পার করে দেয়। যেহেতু সামনে ছিল বিএনপির বিজয় মিছিলের কারণে যানজট, গাড়ির জটলা। আমি আন্দরকিল্লার আগেই টেম্পুটি থেকে নেমে পড়ি। অসহনীয় গরমে কতক্ষণ গাড়িতে থেমে থাকা যায়? ওই সময়ে আপাতত মুরাদপুরে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিই।
আন্দরকিল্লা থেকে হেঁটে চেরাগী পাহাড়ে এসে কদম মোবারক মসজিদে শেষ সময়ের দিকে আসরের নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে চেরাগী পাহাড় চেরাগী রেস্তোরাঁর সামনে থেকে রিকশা-টেম্পু-ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করি। গন্তব্য মুরাদপুর শাহ আমানত হজ্ব কাফেলা। ৮০/১০০ টাকার ভাড়া ট্যাক্সি চাইলো প্রায় ১৫০/১২০/১৩০ টাকা। ১১০ টাকা বলেও কোনো টেক্সিওয়ালাকে রাজি করাতে পারলাম না। হায় দুঃখ। অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পর মুরাদপুরমুখী একটি টেম্পু এলো। একটি সিট খালি পেয়ে তাতে উঠলাম। কিন্তু বিধি বাম। টেম্পুটি চকবাজার পর্যন্ত গিয়েই সব যাত্রীকে নামিয়ে দিল। সামনে যানজট। তাই মুরাদপুর যাবে না। পথে পথে যানজটের বলী হলাম আমরা নিরীহ যাত্রীরা। হেঁটে হযরত অলি খাঁ (রহ.) মসজিদ পর্যন্ত গিয়ে আবারও মুরাদপুরমুখী টেম্পু ধরলাম। চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত টেম্পু ভাড়া ১৫ টাকা। এখন আমাকে ভাড়া গুনতে হয়েছে ৫ টাকা বেশি অর্থাৎ ২০ টাকা। চকবাজার পর্যন্ত ১০ টাকা। সেখান থেকে মুরাদপুর ১০ টাকা, মোট ২০ টাকা। আমার সময়ও অপচয় হলো, বাড়তি টাকাও গচ্চা গেল। এদিকে, মুরাদপুর থেকে টেম্পুযোগে ফিরছিলাম আন্দরকিল্লায়। রাত ৯ টায় দৈনিক আজাদীতে অফিস। কিন্তু সেখানেও বিড়ম্বনা। টেম্পুওয়ালা বললো, চকবাজার পর্যন্ত যাবে। যেহেতু পথে পথে যানজট পেরিয়ে লোকসান দিয়ে বাড়তি গ্যাস তেল পুড়িয়ে কোতোয়ালী মোড় পর্যন্ত যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যাত্রীদের মধ্যে একমাত্র আমি প্রতিবাদ করলাম। টেম্পুওয়ালাকে বললাম, কোতোয়ালী মোড় পর্যন্ত যাওয়ার ট্যাক্সি চকবাজার পর্যন্ত যাবে কেন? টেম্পুওয়ালা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। বললো, আমার পোষাচ্ছে না, তাই আমি যাচ্ছি না। ১৫ লাখ টাকার গাড়ি। প্রতিদিন দুই-আড়াই হাজার টাকা খরচ। মালিককে দিতে হয় ১১০০ টাকা। আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে পড়ে লস দিচ্ছি। আমাদের অবস্থা-দুর্দশা কে দেখে?
টেম্পুটি চকবাজার নামিয়ে দেয়ার পর আরেক টেম্পুতে উঠি। সেটির গন্তব্য আন্দরকিল্লা হয়ে কোতোয়ালী মোড়। আমি আন্দরকিল্লায় নেমে পড়ি। ভাড়া চাইলো ১২ টাকা। সাধারণত মুরাদপুর থেকে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত টেম্পুভাড়া ১৭ টাকা। এখন আমাকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ৫ টাকা অর্থাৎ ২২ টাকা। এই হলো, নগরীর যাত্রীদের দশা। সময়ও লস, টাকাও লস। হয়রানি-বিড়ম্বনা তো আছেই।
নানা উপলক্ষে নানা সংস্থা সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। রাজপথ দখল করে সমাবেশ-মিছিলের কারণে জনদুর্ভোগ অসহনীয় হয়ে ওঠে। রাস্তা বন্ধ করে জনভোগান্তি সৃষ্টির আয়োজন কেন চলবে? এর বিকল্প আজ সবাইকে ভাবতে হবে। যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে যাত্রীদের কষ্ট হয়, রোগীদের বিড়ম্বনা বাড়ে, ট্রেন-বাস-বিমানমুখী যাত্রীরা সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছুতে পারে না। এতে তাদের সময়ও অর্থের অপচয় হয়-এটা তো বিবেচনায় আনতে হবে। মিটিং মিছিলের জন্য একটা নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করে দেওয়া যায় না? সভা-সমাবেশ মিছিলসহ রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য রাজপথের পরিবর্তে আজ বিকল্প পথের কথা ভাবতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক আজাদী, গবেষক, কথাসাহিত্যিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *